সিবিএন ডেস্ক ;

কলম্বিয়ার সান্তা মার্তায় অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি বিরোধী কনফারেন্সে ‘এশীয় তারুণ্য পলিসি ব্রিফিং’-এর অংশ হিসেবে কক্সবাজারে এক বিশেষ তারুণ্য সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিইএইচআরডিএফ)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সংলাপে মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভয়াবহ পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় জীবন-জীবিকার সংকট নিরসনে একগুচ্ছ প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।

সংগঠনের প্রধান নির্বাহী ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ এক্টিভিস্ট মোঃ ইলিয়াছ মিয়া-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সংলাপে মহেশখালীর বিভিন্ন প্রান্তের তরুণ প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী ও পরিবেশ কর্মীরা বৈশ্বিক জলবায়ু রাজনীতির প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সংকটের চিত্র তুলে ধরেন।

কয়লা বিদ্যুতের বদলে সমুদ্র বন্দর ও গ্রিন এনার্জি
সভাপতির বক্তব্যে পরিবেশ এক্টিভিস্ট মোঃ ইলিয়াছ মিয়া বলেন, “কলম্বিয়ার সান্তা মার্তায় আমরা এশীয় তরুণদের পক্ষ থেকে যে পলিসি ব্রিফিং দেব, সেখানে মহেশখালীর এই আর্তনাদ প্রতিফলিত হবে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবর্তে মাতারবাড়ীতে একটি পূর্ণাঙ্গ সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করা হোক। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকার পুরো উপকূল জুড়ে বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে জ্বালানি রূপান্তর (Energy Transition) নিশ্চিত করতে পারে।”

বিপন্ন কৃষি ও বাস্তুচ্যুতির হুমকি
সংলাপে সিইএইচআরডিএফ-এর উপ-প্রধান সমন্বয়ক ও পরিবেশ এক্টিভিস্ট রুহুল আমিন বলেন, “ব্যক্তিগত লভ্যাংশের জন্য মহেশখালীর উপকূলকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। লবণ, মাছ ও পান ধ্বংস হওয়ার ফলে ২৫০ বছরের পুরোনো ভিটেমাটি ত্যাগ করে মানুষ আজ বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে ৬ষ্ঠ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে আমাদের কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি।”

তরুণ এক্টিভিস্ট রাজু আহমেদ (২৫) অভিযোগ করেন, কয়লা শোধনের ফলে নদী ও পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে তা অপূরণীয়। অথচ মামলা-হামলার ভয় ও সরকারি সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয়দের প্রতিবাদে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তরুণ এক্টিভিস্ট মঈন (২৬) জানান, কয়লার প্রভাবে পানের বরজের উৎপাদন তলানিতে ঠেকেছে।

বৈশ্বিক প্রভাব ও পরিবেশগত বিপর্যয়
পরিবেশ কর্মী সায়মুন ইসলাম তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, “কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে প্যারাবন নষ্ট হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এসিড বৃষ্টির মতো দুর্যোগের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এটি শুধু স্থানীয় নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু।” পরিবেশ কর্মী ইয়াছিন আরাফাত (১৯) ও শিক্ষার্থী তারেক রহমান (১৮) এই পরিবেশগত সংকটকে স্থানীয় জীবিকার ওপর চরম আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেন।

তথ্য গোপন ও জবাবদিহিতার দাবি
সংলাপে স্থানীয় পরিবেশ কর্মী আনোয়ার বলেন, “ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে তথ্য গোপন করে বিদেশের সাথে চুক্তি করা হচ্ছে, যা মহেশখালীসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মৎস্য ও লবণ শিল্পকে ধ্বংস করে দেবে।” শিক্ষার্থী মারুফ (২০) ও তরুণ এক্টিভিস্ট ইমন (২৫) সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের সাথে ‘অজবাবদিহিতামূলক’ আচরণ এবং জনপ্রতিনিধিদের উদাসীনতাকে দায়ী করেন।

সংলাপ থেকে উত্থাপিত প্রধান প্রস্তাবনাসমূহ:
১. পলিসি ব্রিফিং: কলম্বিয়ার সান্তা মার্তা কনফারেন্সে এশীয় তরুণদের পক্ষ থেকে কয়লা বিদ্যুতের পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরা।
২. বিকল্প রূপান্তর: মাতারবাড়ীতে কয়লা ভিত্তিক প্রকল্পের পরিবর্তে সমুদ্র বন্দর এবং বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিস্থাপন।
৩. সম্পদ রক্ষা: উপকূলীয় মাছ, লবণ ও পানের বরজ রক্ষায় কার্যকরী সুরক্ষা ব্যবস্থা ও বিশেষ ভর্তুকি নিশ্চিত করা।
৪. বাস্তুচ্যুতদের অধিকার: ২৫০ বছরের আদি বসতি রক্ষা এবং স্থানীয়দের ভিটেমাটি নিশ্চিত করা।

সিইএইচআরডিএফ নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে পরিবেশবিধ্বংসী জীবাশ্ম জ্বালানি নীতি ত্যাগ করে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি’ নীতি গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।